কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে সিউল যাচ্ছেন হুমায়ুন

ঢাকা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির দুই দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে সিউলের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। সফরে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন আজ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার পর হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘সফরকালে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাব।’

তিনি বলেন, ঢাকা ও সিউলের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের ভিত্তি তৈরি করাই এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম দিকের বিদেশ সফরের অন্যতম।

সিউলে অবস্থানকালে হুমায়ুন কবির দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম ভাইস মিনিস্টার, বাণিজ্যবিষয়ক উপমন্ত্রী, জাতীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপমন্ত্রী এবং কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (কোয়িকা) চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের অগ্রাধিকারভুক্ত দ্বিপক্ষীয় অংশীদার এবং আমরা এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চাই।’

এ সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)-এর সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন হুমায়ুন কবির। তিনি কেইপিজেডকে ‘চমৎকার একটি ইপিজেড মডেল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, গত ১৫ বছরে এর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।

হুমায়ুন অভিযোগ করেন, আগের বিএনপি সরকারের সময়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল বলে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার কেইপিজেডকে যথাযথভাবে ব্যবহার করেনি। তিনি এটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘কোরিয়ান ইপিজেড এমন একটি চমৎকার প্রকল্প। আগের বিএনপি সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল বলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কারণ শেখ হাসিনা সরকার এটি কাজে লাগায়নি।’

এ ধরনের মনোভাব দেশের অর্থনীতি ও স্বার্থের ক্ষতি করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি আগের সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও করেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ ধরনের অসুস্থ মানসিকতা দেশের ও অর্থনীতির ক্ষতি করেছে। তারা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও লুট করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।’

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জাতীয় স্বার্থে নেওয়া উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখবে এবং এগুলো আরও এগিয়ে নেবে।

তিনি বলেন, ‘এখন ইনশাআল্লাহ দেশপ্রেমিকরা দেশ পরিচালনা করছেন। দেশের জন্য যা উপকারী, এই সরকার তা অব্যাহত রাখবে এবং এগিয়ে নেবে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান সরকার কেইপিজেডকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগ্রহী। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়ায় এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে- এমন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’

বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, জাহাজ নির্মাণ, প্রযুক্তি এবং প্রকল্প অর্থায়নে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এ সফর বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়াকে অগ্রাধিকারভুক্ত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

এর আগে রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুনের সঙ্গে বৈঠকে হুমায়ুন কবির বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঢাকা অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।

বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তি খাতে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

রাষ্ট্রদূত কিম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণ ব্যক্তিগতভাবে কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি এটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের দিকে ‘খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, তার সিউল সফরের প্রধান লক্ষ্য হবে পরবর্তী পর্যায়ের যোগাযোগের পথ তৈরি করা এবং দুই দেশের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে আরও বেশি বিনিময়ের ভিত্তি তৈরি করা।

তিনি জানান, বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়া সফর করতে পারেন। এরপর চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে অর্থমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) নিয়ে অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চুক্তিটি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

নতুন করে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ তার সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে।

তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ-সম্পর্কিত সহযোগিতা, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রকল্প অর্থায়নসহ বিভিন্ন খাতে কোরিয়ার বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখিয়েছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্ক আরও জোরদারের ভিত্তি হিসেবে তার সফর কাজ করবে এবং আগামী দিনগুলোতে উচ্চপর্যায়ের আরও যোগাযোগের পথ তৈরি করবে।

এদিকে কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত দুই দেশের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের প্রশংসা করেন এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদারে সিউলের আগ্রহের কথা জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বৈঠকটি শেষ হয়।